• বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
  • ঢাকা, বাংলাদেশ
সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার মৌলিক রূপান্তর সম্ভব নয় প্রয়োজন সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে নয়াগণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা
সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার মৌলিক রূপান্তর সম্ভব নয় প্রয়োজন সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে নয়াগণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা

  আন্দোলন প্রতিবেদন  

রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২০  |  অনলাইন সংস্করণ

কোভিড-১৯ মহামারী সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী এক মহাসংকটের সৃষ্টি করেছে। যা অর্থনীতির ক্ষেত্রে তো বটেই এমনকি করোনা স্বাস্থ্যখাতের অব্যবস্থাপনাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। অনেক জ্ঞানী, বিদ্বান ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিগণ বলছেন করোনা পরিস্থিতি কেটে গেলে পৃথিবীতে একটি পরিবর্তন প্রয়োজন হবে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও বলেছেন বিশ্ব এখন বিপজ্জনক পর্যায়ে রয়েছে, যেকোনো সময় বিপর্যয় ঘটতে পারে। এই অসমতা দূর করতে বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থা নতুন করে ঢেলে সাজানোর আহবান জানিয়েছেন তিনি। অনেকে বলছেন পৃথিবীতে অনেক সম্পদ আছে, পৃথিবীর সম্পদকে সৃষ্টিকর্তার দান হিসেবে গণ্য করে সব মানুষের এ থেকে উপযোগিতা লাভের সুযোগ করে দিতে হবে। তারা সমাধান হিসেবে জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ডব্লিউএইচও, এফএও-সহ যত বৈশ্বিক সংস্থা আছে সেগুলোকে ব্যাপক সংস্কার করার অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কেউ কেউ পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদকেও এর জন্য দায়ী করছেন। পৃথিবীর পরিবর্তন, রূপান্তরের বিষয় বলা হলেও মূর্ত প্রক্রিয়া-পদ্ধতি কী হতে পারে তা থাকছে বিমূর্ত। যারা মূর্ত প্রস্তাব করছেন তারা সাম্রাজ্যবাদী -পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে থেকেই সংস্কারের কথা বলছেন।

অনেকে এও বলছেন পুঁজিবাদ উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি করে, মুনাফা করে, প্রতিযোগিতা করে- যার কারণে ধনী-গরীবের এই বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে সেই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বসংস্থাগুলোর কিছু সংস্কার দিয়ে কী এটার প্রতিরোধ করা সম্ভব? এই করোনাকালীন সময়েও সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদীরা মুনাফার জন্য ব্যাকুল। এবং এ দেশগুলোতেই সবচেয়ে বেশি করোনা মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশেষত সাম্রাজ্যবাদের পালের গোদা খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে আক্রান্ত এবং মৃতে সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

করোনা একটি বৈশ্বিক সমস্যা, যাকে একটি দেশে সমাধান করা যাবে না। এ অবস্থায় এর প্রতিরোধ, চিকিৎসা- এসবও হতে হবে বৈশ্বিক, যখন তার প্রতিরোধে ভ্যাকসিন বা ঔষধ আবিষ্কৃত হয়নি। যখন কিনা বিশ্বের সব দেশের বিজ্ঞানীদের প্রয়াস, গবেষণা, অর্থসংকুলান, জ্ঞান- এ সবকে সমন্বিত করে দ্রুত তার সমাধান বের করা প্রয়োজন। কিন্তু আমরা দেখছি তার উল্টো। ইতিমধ্যে প্রকাশিত তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, এসব আবিষ্কারের ক্ষেত্রে বহু দেশে বহু প্রচেষ্টা চলছে। কেউ কেউ ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সাফল্য দাবি করছে। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে, বেশ গোপনীয়তা রক্ষা করে। এটা তারা করছে কেন? করছে মানবকল্যাণের বিপরীতে ঔষধ, ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে বাণিজ্য করে মুনাফার জন্য। কে কার আগে এই দুষ্প্রাপ্য নতুন পণ্যের এই বিশাল বিশ্ববাজারটি দখল করতে পারবে তার সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা চলছে। আর এ কারণেই তারা বিজ্ঞানীদের বিচ্ছিন্নতা নিবারণ করে সমগ্র বিশ্বের জ্ঞান, প্রজ্ঞাকে, অর্থ ও সামর্থকে মানবজাতির যৌথ কল্যাণে সমাবেশিত করতে সক্ষম নয় এবং তাদের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেও

তারা এড়াতে সক্ষম নয়। বরং তারা করোনা ভাইরাস দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেও দ্বিধা করবে না যার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ইতিমধ্যেই উঠে এসেছে।

আজকে করোনার বৈশ্বিক আক্রমণের মুখে জনগণের দুর্ভোগ হ্রাসের জন্য প্রথম প্রয়োজন ছিল গণমুখী অর্থব্যবস্থার সাথে একটি গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা। উন্নত পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোতেও তা না থাকায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। করোনা নিয়ন্ত্রণে তারা ব্যর্থ হচ্ছে। আমাদের দেশেও তার ব্যতিক্রম নয়। গণবিরোধী স্বাস্থ্যব্যবস্থায় জনগণের চরম দুর্ভোগ নিয়েও বাণিজ্য ও দুর্নীতি চলছে। রিজেন্টের সাহেদ করিম ও জেকেজির আরিফুল গংদের জালিয়াতি, প্রতারণা তার একটি ক্ষুদ্র প্রকাশ মাত্র। আর বিশাল জনগণকে বঞ্চিত করে ক্ষমতাসীনদের ক্ষুদ্র অংশের সুচিকিৎসার চেষ্টা চলছে প্রকাশ্যেই। আর সাধারণ জনগণ সুস্থ থাকার জন্য হাসপাতালে হাসপাতালে পাগলের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে, কবিরাজ ধরছে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইছে। তা করছে শুধু করোনার জন্যই নয়, যেকোনো মরণব্যাধী থেকে বাঁচার জন্য।

আমূল রূপান্তরের জন্য সমাজের অর্থনীতির সাথে এই ব্যবস্থার বহু ক্ষেত্রেই সামগ্রিক রূপান্তর দরকার তার একটি হলো স্বাস্থ্যব্যবস্থা। হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকার করোনা মোকাবেলা ব্যর্থ হয়ে (নাকি ইচ্ছাকৃত!) এখন জনগণের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন সামনে এনে বড় বুর্জোয়া ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় যে সব গণবিরোধী পদক্ষেপ নিয়েছে তাতে করোনা বহুগুণ ছড়িয়েছে। তাতে শ্রমিক-শ্রমজীবী জনগণের একটা অংশ কাজ করতে পারলেও ব্যাপক গার্মেন্ট শ্রমিক, দোকান কর্মচারী, গৃহকর্মী, শিক্ষক, বিদেশ  ফেরত প্রবাসী শ্রমিক-সহ লক্ষ লক্ষ জনগণ বেকার হয়ে পড়েছেন। বিশ্বের কোটি কোটি জনগণ বেকার হয়েছেন বা দারিদ্র সীমার নীচে নেমে গেছেন বা যাবেন। ফলে করোনা পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পরিবর্তনের যে আওয়াজ উঠছে তার প্রয়োজনও রয়েছে, কিন্তু তা বুর্জোয়া সংস্কারে সম্ভব নয়। প্রয়োজন বৈশ্বিক অর্থনীতির বিপ্লবী রূপান্তর, তার জন্য প্রয়োজন বিপ্লবী কর্মসূচির। যার আলোচনা করাটাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ করোনার চেয়ে বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই জনগণের বড় শত্রু। কিন্তু যেহেতু আজকের বিশ্ব সম্মুখ সমস্যা হিসেবে করোনা মোকাবেলায় ব্যস্ত এবং হিমশিম খাচ্ছে, তাই স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে কথা বলাও জরুরি।

দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা যে ভেঙ্গে পড়েছে তা সবাই বলছে, প্রধানমন্ত্রী এবং তার কিছু বাচাল মন্ত্রীরা বাদে। তারা বলছে প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ্য নেতৃত্বে করোনা তারা সফলভাবে মোকাবেলা করছে। জনগণের সমালোচনার মুখে তারা বলছে উন্নত বিশ্বই তো পারছে না, তাদের অবস্থা আরো খারাপ, বরং আমরা ভালো করছি। তার জন্যই এদেশে মৃত্যু কম হচ্ছে- ইত্যাদি। অথচ প্রতিদিন বুর্জোয়া পত্রিকায় করোনা মোকাবেলার ব্যর্থতার এবং অন্যন্য রোগে আক্রান্ত রোগীদের করুণ দশার সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। সরকারি হিসেবের বাইরে বুর্জোয়া পত্রিকাগুলো প্রতিদিন করোনা উপসর্গ জ্বর, সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্ট নিয়ে মৃত্যুর তালিকা প্রকাশ করছে। যা সরকারি হিসেবের সাথে যোগ হলে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ।

তাসত্ত্বেও বাংলাদেশে ইউরোপ আমেরিকার চেয়ে মৃত্যুর হার কম। সেটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আবহাওয়া, জনগণের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অন্য কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকতে পারে আলোচনায় তা উঠে আসতে শুরু করেছে। কিন্তু ”ঝড়ে বক মরে ফকিরের কেরামতি বাড়ে”- গ্রাম্য প্রবাদের মতো হাসিনা সরকারের দশাও তাই।  দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই মৃত্যু এবং আক্রান্তে সংখ্যা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক অনেক কম, এমনকি কোনো কোনো দেশে শূন্যের কোটায় রয়েছে। হাসিনা সরকার কিন্তু তা বলছে না। আক্রান্তের হার ভারত-বাংলাদেশে কম তা কোন ফর্মুলায়ই বলা যাবে না। হাসিনা সরকার কম পরীক্ষা, কম শনাক্ত এবং জনগণকে হাসপাতাল বিমুখ করার বদমাইশী কৌশল নিয়ে স্বাস্থ্যখাতে বড় দুর্নীতি করে চলেছে। স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতি সম্পর্কে বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীগণই প্রতিদিন বলে বলে গলদঘর্ম হচ্ছেন। কিন্তু তারা বুর্জোয়া ব্যবস্থার মধ্যেই সমাধান খুঁজছেন, ব্যবস্থার পরিবর্তে ব্যক্তিদের দায়ী করছেন বা অনেকে বলছেন আমরাই খারাপ- এমন গণবিরোধী বক্তব্যও দিচ্ছেন- ইত্যাদি।

এই শোচনীয় অবস্থার কারণ কী? তা হলো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে বেসরকারিকরণ। স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ‘সেবামূলক’ পেশার জায়গা থেকে প্রকাশ্যে বাণিজ্যিকীকরণ করার কারণে। যখন বেসরকারিকরণ হচ্ছে, তখন ডাক্তাররা মুনাফা খুঁজবেন, প্রাইভেট প্র্যাকটিস করবেন, বড় বড় হাসপাতাল বানাবেন, মুনাফা লুটবেন, জীবনের ঝুঁকি নেবেন না- এটাই স্বাভাবিক। ডাক্তারদের এই আত্মস্বার্থ যে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে বেসরকারিকরণের সরকারি ব্যবস্থা থেকে উদ্ভ‚ত তা কেউ বলছেন না। হাসিনা সরকার জীবনের ঝুঁকি নিতে অস্বীকার করা ডাক্তারদের উপর হম্বিতম্বি করেছে এবং ডাক্তারদের বিশেষ বেতন-ভাতার লোভ দেখিয়ে তাদের আরেকবার কলুষিত করেছে। মুনাফা না হলে বা ঝুঁকি দেখলে মালিক এবং ডাক্তাররা হাসপাতাল বন্ধ রাখবে- এই গণবিরোধী ব্যবস্থায় তা কি স্বাভাবিক নয়? পরীক্ষায় জালিয়াতি, প্রতারণার নতুন মাত্রা তার সাথেই যুক্ত।

আর সরকারি হাসপাতালগুলোও গণমুখীভাবে পরিচালনা করতে গণবিরোধী সরকার ব্যর্থ। ঘুষ-দুর্নীতি ছাড়া এখানে চিকিৎসা চলে না তা ওপেনসিক্রেট। চিকিৎসা পেতে হলে বেসরকারি হাসপাতালে যাও, না হলে ঘুষ দাও- এই হচ্ছে সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা। তাই করোনাকালেও মানুষ চিকিৎসা পাচ্ছেন না। পথে পথে ঘুরেই মানুষ মারা যাচ্ছে। এখন চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের এমন অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে যে মানুষ এখন আর হাসপাতালমুখী হচ্ছেন না। যখন নাকি করোনা আক্রান্ত ঊর্ধ্বমুখী। কম পরীক্ষায়ও শনাক্তের সংখ্যা প্রতিদিন ৩ হাজারের বেশি। হাসিনা সরকার জনগণকে হাসপাতাল বিমুখ করার জন্য বিভিন্ন অজুহাত তুলে করোনা পরীক্ষার ফি নির্ধারণ এবং কম পরীক্ষা, কম শনাক্ত, পরীক্ষার ফলাফল পেতে বিলম্ব, চিকিৎসায় অব্যবস্থাপনা- এই সব অপকৌশল করেছে। এতেও হাসিনা সরকার সফল! জনগণের ৯০% এখন পরীক্ষা বিমুখ হয়েছেন। এখন করোনার জন্য তৈরি হাসপাতালগুলো বন্ধের ঘোষণা দিয়ে করোনা মোকাবেলায় সাফল্যের ব্যর্থ বগল বাজাচ্ছে।

সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় স্বাস্থ্যখাত যে কল্যাণমুখী হবার নয়, তার কারণ কিছুটা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। যেখানেই সরকারি ব্যবস্থা সেখানেই চলে অবাধে লুটপাট, দুর্নীতি। এই করোনাকালেও স্বাস্থ্যখাতের উচ্চ মহলের লাগামহীন দুর্নীতি নগ্নভাবে প্রকাশিত। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের দুর্নীতি নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়েছে, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়েছে। যদিও স্বাস্থ্যমন্ত্রী দুই কান কাটা লোকের মতো তা অস্বীকার করে চলেছে এবং করোনা মোকাবেলায় সফল বলে দাবি করছে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় চলা ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার প্রকল্পের উপরে দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। রাষ্ট্রের সমস্ত খাতের মতো স্বাস্থ্যখাতেও যে দুর্নীতি সর্বদাই চলছে তা জনগণ হারে হারে টের পেলেও প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানেন না! এখন যেহেতু রিজেন্ট ও জিকেজি হাসপাতালের জালিয়াতি, প্রতারণা পচা দগদগে ঘায়ের মতো প্রকাশ হয়ে পড়ছে। তখন তাকে দমনের নামে মূলত জনগণের আইওয়াশ চলছে।

আলোচিত সাহেদ করিমের নামে ৫২টি প্রতারণার মামলা থাকা, তার একটির জন্য সাজা এবং জরিমানার নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কেন সে জেলে গেল না? সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের চেয়েও বড় আওয়ামী লীগার হিসেবে পরিচয় দিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারল? এই সব প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও কিভাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে করোনা পরীক্ষার অনুমোদন পেল? যদিও এ সব কারণে হাসিনা সরকার এখন কিছুটা চাপের মুখে রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ কিছু কর্মকর্তাকে পদত্যাগে বাধ্য করে বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী এবং মধ্যবিত্ত জনগণকে বুঝ দিচ্ছে, আর গলাবাজি করাছে আমরা তো দুর্নীতি দমন করছি। থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়াতে জেকেজি ও রিজেন্ট হাসপাতালের মতো আরো পাঁচটি হাসপাতালের করোনা পরীক্ষা বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সেগুলো এখনো আলোচনায় উঠে আসছে না কেন এমন প্রশ্নও উঠে আসছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মধ্যে চলছে দ্বন্দ্ব । যা মার্চের প্রথমেই শুরু হয়েছিল এবং এখন চরম আকার ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ বলছেন তাদের দেয়া পরিকল্পনা এবং পরামর্শ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। মন্ত্রী থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পর্যন্ত সবার মধ্যে অনাস্থা ও অনৈক্য প্রকট হয়ে উঠেছে। মহামারির এই জরুরি সময়ে জেকেজি ও রিজেন্ট-সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি নিয়ে অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ব্যস্ত আছেন নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের কাজে। ফলে করোনা মোকাবেলায় চলছে বিপজ্জনক স্থবিরতা। সামনে ঈদুল আজহায় করোনা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞগণ যেখানে বলছেন জনসংখ্যা অনুপাতে দৈনিক ২৪-২৫ হাজার পরীক্ষা হওয়া প্রয়োজন ছিল। সেখানে হচ্ছে ১৩ হাজারেরও কম। প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার জন্য মহামারি নিয়ন্ত্রণে নেই। যার ভোগান্তি জনগণকেই ভোগ করতে হচ্ছে/হবে।

এছাড়াও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত ঔষধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর উৎপাদন ও বিপণন। এগুলো সম্পূর্ণ অলাভজনক প্রতিষ্ঠান বা সরকারি না হলে বুর্জোয়া ব্যবসায়ীদের মুনাফার বলি জনগণকে হতে হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না, তা হচ্ছেও। পিপিই এবং এন-৯৫ নং মাস্ক নিয়ে যে প্রতারণা, দুর্নীতি হয়েছে তা সঠিক প্রমাণিত হয়েছে বলে পত্রিকায় প্রকাশ। এখন বিদেশ থেকে ভ্যাকসিন ও ঔষধ এনে কীভাবে মুনাফা করবে সে আশায় প্রহর গুনছে দালাল ব্যবসায়ী মহল।

সুতরাং স্বাস্থ্যব্যবস্থার আমূল মৌলিক রূপান্তর ছাড়া বুর্জোয়া সংস্কারে তার নিরসন হবার নয়। তার জন্য স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয়করণ এবং দুর্নীতি উচ্ছেদ করাই হলো মূল পদক্ষেপ। দুর্নীতি করে যেন কেউ বাড়ি-গাড়ির মালিক হতে না পারে এবং বিদেশে টাকা পাচার করে বিদেশি ব্যাংকে জমাতে না পারে বা মালয়েশিয়া, কানাডার বেগম পাড়ার বাসিন্দা হবার সুযোগ না পায়। এর সাথেই চিকিৎসক ও চিকিৎসা কর্মীদেরকে মানব ও আর্তের সেবাকে পরিণত করার প্রক্রিয়া-পদ্ধতি নিতে হবে। এই সবকে পরিপূর্ণভাবে করা যাবে কেবলমাত্র ব্যক্তিমালিকানা উচ্ছেদ করে। এবং সেটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। না হলে পুঁজিবাদ থাকবে, ব্যক্তিমালিকানা থাকবে আর দুর্নীতি থাকবে না, স্বার্থপরতা থাকবে না- সেটা হতে পারে না। আর শুধু স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করলেই হবে না,  দেখতে হবে রাষ্ট্র কার স্বার্থ রক্ষা করছে, জনগণের নাকি গণশত্রুদের। নিশ্চিত করতে হবে জনগণের স্বার্থের রাষ্ট্রব্যবস্থাকেও।

তাই স্বাস্থ্যব্যবস্থার রূপান্তর তথা কল্যাণমুখী করার জন্য প্রয়োজন বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা। প্রকৃত সমাজতান্ত্রিক দেশেই তা সম্ভব হয়েছিল। লেনিন-স্টালিনের রাশিয়া এবং মাওয়ের সময়কার চীনে যেমন স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল তা বুর্জোয়া শাসকরা অস্বীকার করলেও প্রগতিশীল জনগণের জানা আছে। একটি পরিপূর্ণ গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে চীনে নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবকালেই যেমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল তার প্রাথমিক রূপরেখা তুলে ধরেই আমাদের দেশে  গণমুখীস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি তুলতে হবে, জনগণকে সচেতন ও সজ্জিত করতে হবে।

গণবিরোধী স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাতিল এবং গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষে নিম্নতমদাবির ভিত্তিতে সংগঠিত হোন, আন্দোলন গড়ে তুলুন!

১। ব্যক্তিমালিকানার মুনাফাভিত্তিক গণবিরোধী, দুর্নীতিবাজ চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাতিল করতে হবে!

২। সমগ্র চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করতে হবে!

- বিদেশি ঔষধ ও স্বাস্থ্যসামগ্রী উৎপাদনকে জাতীয়করণ করতে হবে!

-  সমগ্র স্বাস্থ্যব্যবস্থা, স্বাস্থ্য সামগ্রী নিয়ে বাণিজ্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে!

৩। চিকিৎসা ব্যবস্থায় সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ ও মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াদের স্বার্থে বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে!

৪। ডাক্তারদের প্রাইভেট চেম্বার খোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।

- অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে তাদের প্র্যাকটিসের সময় ও জনগণের সাধ্যর মধ্যে ফি নির্ধারণ করে দিতে হবে!

- ডাক্তারদের বিশ্রাম, চিন্তা, গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সময় ব্যয় করার দিকনির্দেশনা থাকতে হবে!

- ডাক্তারদের চাকরি নিয়ে বিদেশে যাওয়া নিষিদ্ধ করতে হবে!

৫। ডাক্তারদের ঘরে ঘরে রোগীর কাছে যেতে হবে! যাতে প্রচন্ড রোদের মাঝে করোনা রুগীদের পরীক্ষার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে না থাকতে হয়। একে মৌলিকভাবে বদলে ফেলতে হবে!

- বিনা ফিতে করোনা পরীক্ষা করতে হবে!

- প্রতিটি মানুষকে করোনা পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে। সে করোনায় আক্রান্ত হোক বা না হোক!

- প্রতিটি মানুষের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখতে হবে, সে রোগী হোক বা না হোক।

৬। চিকিৎসা ব্যবস্থা চলবে সম্পূর্ণ বিনা পয়সায়। নাগরিকগণ চিকিৎসা খাতে মাসে বা বছরে তাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য স্বাস্থ্যকর দিবেন তাদের শ্রেণি অনুযায়ী।

- নাগরিকদের পরীক্ষা, চিকিৎসা ও ঔষধ- এই সব খরচ সরকারি অর্থে ব্যয় করতে হবে- এটা তাদের মৌলিক অধিকার!

৭। চিকিৎসা ব্যবস্থা শহর-নগরকেন্দ্রিক ও মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত কেন্দ্রিক সীমাবদ্ধ রাখা চলবে না!

- চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রামকেন্দ্রিক করতে হবে! (যাতে গ্রামের নাগরিকদের চিকিৎসার জন্য শহরে দৌড়াদৌড়ি করতে না হয়!)

৮। প্রতিটি ইউনিয়নভিত্তিক হাসপাতাল নির্মাণ, ডাক্তারদেরকে সেখানে নিয়োগ, প্রতি ডাক্তার পিছু ৩ জন নার্স ও সে অনুযায়ী টেকনিশিয়ান নিয়োগ দিতে হবে!

- এজন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ নার্সিং ও টেকনিশিয়ান কলেজ স্থাপন ও ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করতে হবে!

৯। শহরে করোনা বা যেকোনো মহামারির চিকিৎসাকেন্দ্র বস্তিগুলোতে বা বস্তিসম বাসস্থানগুলোতে করতে হবে!

১০। সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতের উপর নির্ভর না করে দেশের গবেষণাকে ভিত্তি করতে হবে।সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের মুনাফা ও টাকা বানানোর গবেষণাকে বর্জন করতে হবে!

- গণস্বাস্থ্যের কিট ৭০%-এর বেশি কার্যকর নয়- এই অজুহাতে বাতিল করা চলবে না!

- গণস্বাস্থ্যের কিটে করোনা পরীক্ষার জন্য অনুমোদন দিতে হবে। কারণ পিসিআর টেস্টও ৭০%-এর বেশি কার্যকর নয়। (অনেক গবেষকদের মত)

১১। দেশজ প্রাচীন চিকিৎসা ও হোমিওপ্যাথির গবেষণা বাড়িয়ে তাকে আধুনিক চিকিৎসার সাথে সমন্বিত করতে হবে!

১২। বাজেটে স্বাস্থ্যখাতকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

- স্বাস্থ্য-বাজেটে নামমাত্র বরাদ্দ বাড়ানো (মাত্র ০.৪%) চলবে না।

- বাজেটে অন্তত ১০ থেকে ২০% বরাদ্দ দিতে হবে!

১৩। আমলা, ব্যবসায়ী, দলবাজ ডাক্তার, দলবাজ শ্রমিকনেতা নামের বুর্জোয়া ও আওয়ামী মাস্তান ও দুর্নীতিবাজদের উপর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ছেড়ে দেয়া চলবে না!

- মহামারির মতো জাতীয় দুর্যোগে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ, সংগঠিত ও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে!

১৪। একজন সাহেদ বা একজন সাবরিনাকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করে বা ২/৪ জন কর্মকর্তাকে বাদ দিয়ে সমগ্র স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি ব্যবস্থাকে আড়াল করার আইওয়াশ চলবে না! এর পেছনের হোতাদের চিহ্নিত ও শাস্তি দিতে হবে!

- বিদ্যমান দুর্নীতিপরায়ণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্মোচন ও স্বীকৃতি দিতে হবে!

১৫। সেনাবাহিনীর মতো সুশৃংখল, কষ্টসহিষ্ণু ও প্রযুক্তিসমৃদ্ধ সরকারি সংস্থাকে মহামারির মতো কাজে ব্যাপকভাবে জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সেবা করার জন্য নিয়োগ দিতে হবে!

১৬। জনগণকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক চেতনায় সজ্জিত করা, সমস্ত ধরনের কবিরাজি, পানিপড়াসহ অপচিকিৎসাকে নিষিদ্ধ করা, মহামারি বিষয়ে অবৈজ্ঞানিক প্রচারকে কঠেরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে!

১৭। মহামারিকালে ধর্মপালনের নামে মসজিদ-মন্দির-গির্জা-মাদ্রাসা-জানাজা-তবলীগ-ধর্মীয় সমাবেশকে অবাধে চলতে দেয়া প্রতিরোধ করতে হবে!

১৮। করোনাকালে বা আসন্ন কোরবানির ঈদে সোনাতনী গরুর হাট বসিয়ে করোনা ছড়ানো নিষিদ্ধ করতে হবে এবং সরকারি ব্যবস্থাপনায় অনলাইনে গরু কেনা-বেচার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে!

সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার মৌলিক রূপান্তর সম্ভব নয় প্রয়োজন সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে নয়াগণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা

 আন্দোলন প্রতিবেদন 
রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২০  |  অনলাইন সংস্করণ

কোভিড-১৯ মহামারী সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী এক মহাসংকটের সৃষ্টি করেছে। যা অর্থনীতির ক্ষেত্রে তো বটেই এমনকি করোনা স্বাস্থ্যখাতের অব্যবস্থাপনাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। অনেক জ্ঞানী, বিদ্বান ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিগণ বলছেন করোনা পরিস্থিতি কেটে গেলে পৃথিবীতে একটি পরিবর্তন প্রয়োজন হবে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও বলেছেন বিশ্ব এখন বিপজ্জনক পর্যায়ে রয়েছে, যেকোনো সময় বিপর্যয় ঘটতে পারে। এই অসমতা দূর করতে বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থা নতুন করে ঢেলে সাজানোর আহবান জানিয়েছেন তিনি। অনেকে বলছেন পৃথিবীতে অনেক সম্পদ আছে, পৃথিবীর সম্পদকে সৃষ্টিকর্তার দান হিসেবে গণ্য করে সব মানুষের এ থেকে উপযোগিতা লাভের সুযোগ করে দিতে হবে। তারা সমাধান হিসেবে জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ডব্লিউএইচও, এফএও-সহ যত বৈশ্বিক সংস্থা আছে সেগুলোকে ব্যাপক সংস্কার করার অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কেউ কেউ পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদকেও এর জন্য দায়ী করছেন। পৃথিবীর পরিবর্তন, রূপান্তরের বিষয় বলা হলেও মূর্ত প্রক্রিয়া-পদ্ধতি কী হতে পারে তা থাকছে বিমূর্ত। যারা মূর্ত প্রস্তাব করছেন তারা সাম্রাজ্যবাদী -পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে থেকেই সংস্কারের কথা বলছেন।

অনেকে এও বলছেন পুঁজিবাদ উদ্বৃত্ত মূল্য সৃষ্টি করে, মুনাফা করে, প্রতিযোগিতা করে- যার কারণে ধনী-গরীবের এই বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে সেই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বসংস্থাগুলোর কিছু সংস্কার দিয়ে কী এটার প্রতিরোধ করা সম্ভব? এই করোনাকালীন সময়েও সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদীরা মুনাফার জন্য ব্যাকুল। এবং এ দেশগুলোতেই সবচেয়ে বেশি করোনা মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশেষত সাম্রাজ্যবাদের পালের গোদা খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে আক্রান্ত এবং মৃতে সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

করোনা একটি বৈশ্বিক সমস্যা, যাকে একটি দেশে সমাধান করা যাবে না। এ অবস্থায় এর প্রতিরোধ, চিকিৎসা- এসবও হতে হবে বৈশ্বিক, যখন তার প্রতিরোধে ভ্যাকসিন বা ঔষধ আবিষ্কৃত হয়নি। যখন কিনা বিশ্বের সব দেশের বিজ্ঞানীদের প্রয়াস, গবেষণা, অর্থসংকুলান, জ্ঞান- এ সবকে সমন্বিত করে দ্রুত তার সমাধান বের করা প্রয়োজন। কিন্তু আমরা দেখছি তার উল্টো। ইতিমধ্যে প্রকাশিত তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, এসব আবিষ্কারের ক্ষেত্রে বহু দেশে বহু প্রচেষ্টা চলছে। কেউ কেউ ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সাফল্য দাবি করছে। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে, বেশ গোপনীয়তা রক্ষা করে। এটা তারা করছে কেন? করছে মানবকল্যাণের বিপরীতে ঔষধ, ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে বাণিজ্য করে মুনাফার জন্য। কে কার আগে এই দুষ্প্রাপ্য নতুন পণ্যের এই বিশাল বিশ্ববাজারটি দখল করতে পারবে তার সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা চলছে। আর এ কারণেই তারা বিজ্ঞানীদের বিচ্ছিন্নতা নিবারণ করে সমগ্র বিশ্বের জ্ঞান, প্রজ্ঞাকে, অর্থ ও সামর্থকে মানবজাতির যৌথ কল্যাণে সমাবেশিত করতে সক্ষম নয় এবং তাদের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেও

তারা এড়াতে সক্ষম নয়। বরং তারা করোনা ভাইরাস দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেও দ্বিধা করবে না যার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ইতিমধ্যেই উঠে এসেছে।

আজকে করোনার বৈশ্বিক আক্রমণের মুখে জনগণের দুর্ভোগ হ্রাসের জন্য প্রথম প্রয়োজন ছিল গণমুখী অর্থব্যবস্থার সাথে একটি গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা। উন্নত পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোতেও তা না থাকায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। করোনা নিয়ন্ত্রণে তারা ব্যর্থ হচ্ছে। আমাদের দেশেও তার ব্যতিক্রম নয়। গণবিরোধী স্বাস্থ্যব্যবস্থায় জনগণের চরম দুর্ভোগ নিয়েও বাণিজ্য ও দুর্নীতি চলছে। রিজেন্টের সাহেদ করিম ও জেকেজির আরিফুল গংদের জালিয়াতি, প্রতারণা তার একটি ক্ষুদ্র প্রকাশ মাত্র। আর বিশাল জনগণকে বঞ্চিত করে ক্ষমতাসীনদের ক্ষুদ্র অংশের সুচিকিৎসার চেষ্টা চলছে প্রকাশ্যেই। আর সাধারণ জনগণ সুস্থ থাকার জন্য হাসপাতালে হাসপাতালে পাগলের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে, কবিরাজ ধরছে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইছে। তা করছে শুধু করোনার জন্যই নয়, যেকোনো মরণব্যাধী থেকে বাঁচার জন্য।

আমূল রূপান্তরের জন্য সমাজের অর্থনীতির সাথে এই ব্যবস্থার বহু ক্ষেত্রেই সামগ্রিক রূপান্তর দরকার তার একটি হলো স্বাস্থ্যব্যবস্থা। হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকার করোনা মোকাবেলা ব্যর্থ হয়ে (নাকি ইচ্ছাকৃত!) এখন জনগণের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন সামনে এনে বড় বুর্জোয়া ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় যে সব গণবিরোধী পদক্ষেপ নিয়েছে তাতে করোনা বহুগুণ ছড়িয়েছে। তাতে শ্রমিক-শ্রমজীবী জনগণের একটা অংশ কাজ করতে পারলেও ব্যাপক গার্মেন্ট শ্রমিক, দোকান কর্মচারী, গৃহকর্মী, শিক্ষক, বিদেশ  ফেরত প্রবাসী শ্রমিক-সহ লক্ষ লক্ষ জনগণ বেকার হয়ে পড়েছেন। বিশ্বের কোটি কোটি জনগণ বেকার হয়েছেন বা দারিদ্র সীমার নীচে নেমে গেছেন বা যাবেন। ফলে করোনা পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পরিবর্তনের যে আওয়াজ উঠছে তার প্রয়োজনও রয়েছে, কিন্তু তা বুর্জোয়া সংস্কারে সম্ভব নয়। প্রয়োজন বৈশ্বিক অর্থনীতির বিপ্লবী রূপান্তর, তার জন্য প্রয়োজন বিপ্লবী কর্মসূচির। যার আলোচনা করাটাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ করোনার চেয়ে বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই জনগণের বড় শত্রু। কিন্তু যেহেতু আজকের বিশ্ব সম্মুখ সমস্যা হিসেবে করোনা মোকাবেলায় ব্যস্ত এবং হিমশিম খাচ্ছে, তাই স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে কথা বলাও জরুরি।

দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা যে ভেঙ্গে পড়েছে তা সবাই বলছে, প্রধানমন্ত্রী এবং তার কিছু বাচাল মন্ত্রীরা বাদে। তারা বলছে প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ্য নেতৃত্বে করোনা তারা সফলভাবে মোকাবেলা করছে। জনগণের সমালোচনার মুখে তারা বলছে উন্নত বিশ্বই তো পারছে না, তাদের অবস্থা আরো খারাপ, বরং আমরা ভালো করছি। তার জন্যই এদেশে মৃত্যু কম হচ্ছে- ইত্যাদি। অথচ প্রতিদিন বুর্জোয়া পত্রিকায় করোনা মোকাবেলার ব্যর্থতার এবং অন্যন্য রোগে আক্রান্ত রোগীদের করুণ দশার সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। সরকারি হিসেবের বাইরে বুর্জোয়া পত্রিকাগুলো প্রতিদিন করোনা উপসর্গ জ্বর, সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্ট নিয়ে মৃত্যুর তালিকা প্রকাশ করছে। যা সরকারি হিসেবের সাথে যোগ হলে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ।

তাসত্ত্বেও বাংলাদেশে ইউরোপ আমেরিকার চেয়ে মৃত্যুর হার কম। সেটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আবহাওয়া, জনগণের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অন্য কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকতে পারে আলোচনায় তা উঠে আসতে শুরু করেছে। কিন্তু ”ঝড়ে বক মরে ফকিরের কেরামতি বাড়ে”- গ্রাম্য প্রবাদের মতো হাসিনা সরকারের দশাও তাই।  দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই মৃত্যু এবং আক্রান্তে সংখ্যা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক অনেক কম, এমনকি কোনো কোনো দেশে শূন্যের কোটায় রয়েছে। হাসিনা সরকার কিন্তু তা বলছে না। আক্রান্তের হার ভারত-বাংলাদেশে কম তা কোন ফর্মুলায়ই বলা যাবে না। হাসিনা সরকার কম পরীক্ষা, কম শনাক্ত এবং জনগণকে হাসপাতাল বিমুখ করার বদমাইশী কৌশল নিয়ে স্বাস্থ্যখাতে বড় দুর্নীতি করে চলেছে। স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতি সম্পর্কে বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীগণই প্রতিদিন বলে বলে গলদঘর্ম হচ্ছেন। কিন্তু তারা বুর্জোয়া ব্যবস্থার মধ্যেই সমাধান খুঁজছেন, ব্যবস্থার পরিবর্তে ব্যক্তিদের দায়ী করছেন বা অনেকে বলছেন আমরাই খারাপ- এমন গণবিরোধী বক্তব্যও দিচ্ছেন- ইত্যাদি।

এই শোচনীয় অবস্থার কারণ কী? তা হলো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে বেসরকারিকরণ। স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ‘সেবামূলক’ পেশার জায়গা থেকে প্রকাশ্যে বাণিজ্যিকীকরণ করার কারণে। যখন বেসরকারিকরণ হচ্ছে, তখন ডাক্তাররা মুনাফা খুঁজবেন, প্রাইভেট প্র্যাকটিস করবেন, বড় বড় হাসপাতাল বানাবেন, মুনাফা লুটবেন, জীবনের ঝুঁকি নেবেন না- এটাই স্বাভাবিক। ডাক্তারদের এই আত্মস্বার্থ যে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে বেসরকারিকরণের সরকারি ব্যবস্থা থেকে উদ্ভ‚ত তা কেউ বলছেন না। হাসিনা সরকার জীবনের ঝুঁকি নিতে অস্বীকার করা ডাক্তারদের উপর হম্বিতম্বি করেছে এবং ডাক্তারদের বিশেষ বেতন-ভাতার লোভ দেখিয়ে তাদের আরেকবার কলুষিত করেছে। মুনাফা না হলে বা ঝুঁকি দেখলে মালিক এবং ডাক্তাররা হাসপাতাল বন্ধ রাখবে- এই গণবিরোধী ব্যবস্থায় তা কি স্বাভাবিক নয়? পরীক্ষায় জালিয়াতি, প্রতারণার নতুন মাত্রা তার সাথেই যুক্ত।

আর সরকারি হাসপাতালগুলোও গণমুখীভাবে পরিচালনা করতে গণবিরোধী সরকার ব্যর্থ। ঘুষ-দুর্নীতি ছাড়া এখানে চিকিৎসা চলে না তা ওপেনসিক্রেট। চিকিৎসা পেতে হলে বেসরকারি হাসপাতালে যাও, না হলে ঘুষ দাও- এই হচ্ছে সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা। তাই করোনাকালেও মানুষ চিকিৎসা পাচ্ছেন না। পথে পথে ঘুরেই মানুষ মারা যাচ্ছে। এখন চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের এমন অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে যে মানুষ এখন আর হাসপাতালমুখী হচ্ছেন না। যখন নাকি করোনা আক্রান্ত ঊর্ধ্বমুখী। কম পরীক্ষায়ও শনাক্তের সংখ্যা প্রতিদিন ৩ হাজারের বেশি। হাসিনা সরকার জনগণকে হাসপাতাল বিমুখ করার জন্য বিভিন্ন অজুহাত তুলে করোনা পরীক্ষার ফি নির্ধারণ এবং কম পরীক্ষা, কম শনাক্ত, পরীক্ষার ফলাফল পেতে বিলম্ব, চিকিৎসায় অব্যবস্থাপনা- এই সব অপকৌশল করেছে। এতেও হাসিনা সরকার সফল! জনগণের ৯০% এখন পরীক্ষা বিমুখ হয়েছেন। এখন করোনার জন্য তৈরি হাসপাতালগুলো বন্ধের ঘোষণা দিয়ে করোনা মোকাবেলায় সাফল্যের ব্যর্থ বগল বাজাচ্ছে।

সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় স্বাস্থ্যখাত যে কল্যাণমুখী হবার নয়, তার কারণ কিছুটা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে। যেখানেই সরকারি ব্যবস্থা সেখানেই চলে অবাধে লুটপাট, দুর্নীতি। এই করোনাকালেও স্বাস্থ্যখাতের উচ্চ মহলের লাগামহীন দুর্নীতি নগ্নভাবে প্রকাশিত। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের দুর্নীতি নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়েছে, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়েছে। যদিও স্বাস্থ্যমন্ত্রী দুই কান কাটা লোকের মতো তা অস্বীকার করে চলেছে এবং করোনা মোকাবেলায় সফল বলে দাবি করছে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় চলা ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার প্রকল্পের উপরে দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। রাষ্ট্রের সমস্ত খাতের মতো স্বাস্থ্যখাতেও যে দুর্নীতি সর্বদাই চলছে তা জনগণ হারে হারে টের পেলেও প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানেন না! এখন যেহেতু রিজেন্ট ও জিকেজি হাসপাতালের জালিয়াতি, প্রতারণা পচা দগদগে ঘায়ের মতো প্রকাশ হয়ে পড়ছে। তখন তাকে দমনের নামে মূলত জনগণের আইওয়াশ চলছে।

আলোচিত সাহেদ করিমের নামে ৫২টি প্রতারণার মামলা থাকা, তার একটির জন্য সাজা এবং জরিমানার নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কেন সে জেলে গেল না? সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের চেয়েও বড় আওয়ামী লীগার হিসেবে পরিচয় দিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারল? এই সব প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও কিভাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে করোনা পরীক্ষার অনুমোদন পেল? যদিও এ সব কারণে হাসিনা সরকার এখন কিছুটা চাপের মুখে রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ কিছু কর্মকর্তাকে পদত্যাগে বাধ্য করে বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী এবং মধ্যবিত্ত জনগণকে বুঝ দিচ্ছে, আর গলাবাজি করাছে আমরা তো দুর্নীতি দমন করছি। থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়াতে জেকেজি ও রিজেন্ট হাসপাতালের মতো আরো পাঁচটি হাসপাতালের করোনা পরীক্ষা বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সেগুলো এখনো আলোচনায় উঠে আসছে না কেন এমন প্রশ্নও উঠে আসছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মধ্যে চলছে দ্বন্দ্ব । যা মার্চের প্রথমেই শুরু হয়েছিল এবং এখন চরম আকার ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ বলছেন তাদের দেয়া পরিকল্পনা এবং পরামর্শ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। মন্ত্রী থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পর্যন্ত সবার মধ্যে অনাস্থা ও অনৈক্য প্রকট হয়ে উঠেছে। মহামারির এই জরুরি সময়ে জেকেজি ও রিজেন্ট-সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি নিয়ে অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ব্যস্ত আছেন নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের কাজে। ফলে করোনা মোকাবেলায় চলছে বিপজ্জনক স্থবিরতা। সামনে ঈদুল আজহায় করোনা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞগণ যেখানে বলছেন জনসংখ্যা অনুপাতে দৈনিক ২৪-২৫ হাজার পরীক্ষা হওয়া প্রয়োজন ছিল। সেখানে হচ্ছে ১৩ হাজারেরও কম। প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার জন্য মহামারি নিয়ন্ত্রণে নেই। যার ভোগান্তি জনগণকেই ভোগ করতে হচ্ছে/হবে।

এছাড়াও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত ঔষধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর উৎপাদন ও বিপণন। এগুলো সম্পূর্ণ অলাভজনক প্রতিষ্ঠান বা সরকারি না হলে বুর্জোয়া ব্যবসায়ীদের মুনাফার বলি জনগণকে হতে হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না, তা হচ্ছেও। পিপিই এবং এন-৯৫ নং মাস্ক নিয়ে যে প্রতারণা, দুর্নীতি হয়েছে তা সঠিক প্রমাণিত হয়েছে বলে পত্রিকায় প্রকাশ। এখন বিদেশ থেকে ভ্যাকসিন ও ঔষধ এনে কীভাবে মুনাফা করবে সে আশায় প্রহর গুনছে দালাল ব্যবসায়ী মহল।

সুতরাং স্বাস্থ্যব্যবস্থার আমূল মৌলিক রূপান্তর ছাড়া বুর্জোয়া সংস্কারে তার নিরসন হবার নয়। তার জন্য স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয়করণ এবং দুর্নীতি উচ্ছেদ করাই হলো মূল পদক্ষেপ। দুর্নীতি করে যেন কেউ বাড়ি-গাড়ির মালিক হতে না পারে এবং বিদেশে টাকা পাচার করে বিদেশি ব্যাংকে জমাতে না পারে বা মালয়েশিয়া, কানাডার বেগম পাড়ার বাসিন্দা হবার সুযোগ না পায়। এর সাথেই চিকিৎসক ও চিকিৎসা কর্মীদেরকে মানব ও আর্তের সেবাকে পরিণত করার প্রক্রিয়া-পদ্ধতি নিতে হবে। এই সবকে পরিপূর্ণভাবে করা যাবে কেবলমাত্র ব্যক্তিমালিকানা উচ্ছেদ করে। এবং সেটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। না হলে পুঁজিবাদ থাকবে, ব্যক্তিমালিকানা থাকবে আর দুর্নীতি থাকবে না, স্বার্থপরতা থাকবে না- সেটা হতে পারে না। আর শুধু স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করলেই হবে না,  দেখতে হবে রাষ্ট্র কার স্বার্থ রক্ষা করছে, জনগণের নাকি গণশত্রুদের। নিশ্চিত করতে হবে জনগণের স্বার্থের রাষ্ট্রব্যবস্থাকেও।

তাই স্বাস্থ্যব্যবস্থার রূপান্তর তথা কল্যাণমুখী করার জন্য প্রয়োজন বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা। প্রকৃত সমাজতান্ত্রিক দেশেই তা সম্ভব হয়েছিল। লেনিন-স্টালিনের রাশিয়া এবং মাওয়ের সময়কার চীনে যেমন স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল তা বুর্জোয়া শাসকরা অস্বীকার করলেও প্রগতিশীল জনগণের জানা আছে। একটি পরিপূর্ণ গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে চীনে নয়াগণতান্ত্রিক বিপ্লবকালেই যেমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল তার প্রাথমিক রূপরেখা তুলে ধরেই আমাদের দেশে  গণমুখীস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি তুলতে হবে, জনগণকে সচেতন ও সজ্জিত করতে হবে।

গণবিরোধী স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাতিল এবং গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষে নিম্নতমদাবির ভিত্তিতে সংগঠিত হোন, আন্দোলন গড়ে তুলুন!

১। ব্যক্তিমালিকানার মুনাফাভিত্তিক গণবিরোধী, দুর্নীতিবাজ চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাতিল করতে হবে!

২। সমগ্র চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করতে হবে!

- বিদেশি ঔষধ ও স্বাস্থ্যসামগ্রী উৎপাদনকে জাতীয়করণ করতে হবে!

-  সমগ্র স্বাস্থ্যব্যবস্থা, স্বাস্থ্য সামগ্রী নিয়ে বাণিজ্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে!

৩। চিকিৎসা ব্যবস্থায় সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ ও মুৎসুদ্দি বুর্জোয়াদের স্বার্থে বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে!

৪। ডাক্তারদের প্রাইভেট চেম্বার খোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।

- অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে তাদের প্র্যাকটিসের সময় ও জনগণের সাধ্যর মধ্যে ফি নির্ধারণ করে দিতে হবে!

- ডাক্তারদের বিশ্রাম, চিন্তা, গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সময় ব্যয় করার দিকনির্দেশনা থাকতে হবে!

- ডাক্তারদের চাকরি নিয়ে বিদেশে যাওয়া নিষিদ্ধ করতে হবে!

৫। ডাক্তারদের ঘরে ঘরে রোগীর কাছে যেতে হবে! যাতে প্রচন্ড রোদের মাঝে করোনা রুগীদের পরীক্ষার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে না থাকতে হয়। একে মৌলিকভাবে বদলে ফেলতে হবে!

- বিনা ফিতে করোনা পরীক্ষা করতে হবে!

- প্রতিটি মানুষকে করোনা পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে। সে করোনায় আক্রান্ত হোক বা না হোক!

- প্রতিটি মানুষের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখতে হবে, সে রোগী হোক বা না হোক।

৬। চিকিৎসা ব্যবস্থা চলবে সম্পূর্ণ বিনা পয়সায়। নাগরিকগণ চিকিৎসা খাতে মাসে বা বছরে তাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য স্বাস্থ্যকর দিবেন তাদের শ্রেণি অনুযায়ী।

- নাগরিকদের পরীক্ষা, চিকিৎসা ও ঔষধ- এই সব খরচ সরকারি অর্থে ব্যয় করতে হবে- এটা তাদের মৌলিক অধিকার!

৭। চিকিৎসা ব্যবস্থা শহর-নগরকেন্দ্রিক ও মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত কেন্দ্রিক সীমাবদ্ধ রাখা চলবে না!

- চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রামকেন্দ্রিক করতে হবে! (যাতে গ্রামের নাগরিকদের চিকিৎসার জন্য শহরে দৌড়াদৌড়ি করতে না হয়!)

৮। প্রতিটি ইউনিয়নভিত্তিক হাসপাতাল নির্মাণ, ডাক্তারদেরকে সেখানে নিয়োগ, প্রতি ডাক্তার পিছু ৩ জন নার্স ও সে অনুযায়ী টেকনিশিয়ান নিয়োগ দিতে হবে!

- এজন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ নার্সিং ও টেকনিশিয়ান কলেজ স্থাপন ও ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করতে হবে!

৯। শহরে করোনা বা যেকোনো মহামারির চিকিৎসাকেন্দ্র বস্তিগুলোতে বা বস্তিসম বাসস্থানগুলোতে করতে হবে!

১০। সাম্রাজ্যবাদ ও ভারতের উপর নির্ভর না করে দেশের গবেষণাকে ভিত্তি করতে হবে।সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদের মুনাফা ও টাকা বানানোর গবেষণাকে বর্জন করতে হবে!

- গণস্বাস্থ্যের কিট ৭০%-এর বেশি কার্যকর নয়- এই অজুহাতে বাতিল করা চলবে না!

- গণস্বাস্থ্যের কিটে করোনা পরীক্ষার জন্য অনুমোদন দিতে হবে। কারণ পিসিআর টেস্টও ৭০%-এর বেশি কার্যকর নয়। (অনেক গবেষকদের মত)

১১। দেশজ প্রাচীন চিকিৎসা ও হোমিওপ্যাথির গবেষণা বাড়িয়ে তাকে আধুনিক চিকিৎসার সাথে সমন্বিত করতে হবে!

১২। বাজেটে স্বাস্থ্যখাতকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

- স্বাস্থ্য-বাজেটে নামমাত্র বরাদ্দ বাড়ানো (মাত্র ০.৪%) চলবে না।

- বাজেটে অন্তত ১০ থেকে ২০% বরাদ্দ দিতে হবে!

১৩। আমলা, ব্যবসায়ী, দলবাজ ডাক্তার, দলবাজ শ্রমিকনেতা নামের বুর্জোয়া ও আওয়ামী মাস্তান ও দুর্নীতিবাজদের উপর স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ছেড়ে দেয়া চলবে না!

- মহামারির মতো জাতীয় দুর্যোগে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ, সংগঠিত ও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে!

১৪। একজন সাহেদ বা একজন সাবরিনাকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করে বা ২/৪ জন কর্মকর্তাকে বাদ দিয়ে সমগ্র স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি ব্যবস্থাকে আড়াল করার আইওয়াশ চলবে না! এর পেছনের হোতাদের চিহ্নিত ও শাস্তি দিতে হবে!

- বিদ্যমান দুর্নীতিপরায়ণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্মোচন ও স্বীকৃতি দিতে হবে!

১৫। সেনাবাহিনীর মতো সুশৃংখল, কষ্টসহিষ্ণু ও প্রযুক্তিসমৃদ্ধ সরকারি সংস্থাকে মহামারির মতো কাজে ব্যাপকভাবে জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সেবা করার জন্য নিয়োগ দিতে হবে!

১৬। জনগণকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক চেতনায় সজ্জিত করা, সমস্ত ধরনের কবিরাজি, পানিপড়াসহ অপচিকিৎসাকে নিষিদ্ধ করা, মহামারি বিষয়ে অবৈজ্ঞানিক প্রচারকে কঠেরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে!

১৭। মহামারিকালে ধর্মপালনের নামে মসজিদ-মন্দির-গির্জা-মাদ্রাসা-জানাজা-তবলীগ-ধর্মীয় সমাবেশকে অবাধে চলতে দেয়া প্রতিরোধ করতে হবে!

১৮। করোনাকালে বা আসন্ন কোরবানির ঈদে সোনাতনী গরুর হাট বসিয়ে করোনা ছড়ানো নিষিদ্ধ করতে হবে এবং সরকারি ব্যবস্থাপনায় অনলাইনে গরু কেনা-বেচার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে!

আরও খবর
 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র